Already Planted 18,372 Trees.... Our Mission is To Plant 1 Lac Trees

Monday, March 27, 2017

বৃক্ষমানব: কার্তিক পরামানিক

১০ বছর বয়স থেকে গাছ লাগানো শুরু করেন। জীবনভর গাছ লাগাচ্ছেন এবং অন্যদের গাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করছেন। তাঁর বসতভূমির ধু-ধু বালুচরে এখন সবুজের সমারোহ। চিরসবুজ সেই মানুষটি বলেছেন তাঁর জীবনকথা:


আগে বাড়ি ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের রাধাকান্তপুর গ্রামে। আত্মীয়স্বজন গ্রাম থেকে ভারত পাড়ি দিলে আমরা একা হয়ে পড়ি। বাবা তখন আমাদের নিয়ে আসেন মনাকষা ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামে। এটা পাকিস্তান হওয়ার দুই-তিন বছর পরের কথা। আমার বয়স তখন মাত্র নয় বছর।
কিন্তু নতুন জায়গায় এসে কিছুই ভালো লাগে না। চারদিকে ধু ধু বালুচর। নেই গাছপালা। ঝড়-বাতাসে চোখে-মুখে ধুলা-বালুতে ভরে যায়। বাজার-হাট করতে মনাকষা যেতে হয়। ১২-১৩ কিলোমিটার রাস্তা। পায়ে জুতা-স্যান্ডেল নেই, মাথায় নেই ছাতা। রাস্তার গরম ধুলায় পায়ে ফোসকা পড়ার মতো অবস্থা। মাথার গামছা পায়ে দিয়ে একটু আরাম পাওয়ার চেষ্টা করি। বাবাকে কেঁদে কেঁদে বলি, ‘বাবা, কোন দেশে নিয়ে এলে। চলো, অন্য জায়গায় চলে যাই।’ বাবা সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘দুঃখ করিস না বাবা, দেখবি কেউ একজন ঠিক দাঁড়িয়ে যাবে। গাছ লাগাবে, ওর দেখাদেখি তখন আরও কেউ গাছ লাগাবে। দেশ গাছে গাছে ভরে যাবে। গাছ লাগানো অনেক পুণ্যের কাজ। কী হবে গয়া-কাশি গিয়ে? তার থেকে বেশি পুণ্য হবে গাছ লাগালে।’ বাবার এ কথা আমার কচি মনে গেঁথে যায়। মনে মনে বলি, আমিই দাঁড়াব গাছ লাগানোর জন্য।
একদিন মা আমাকে নিয়ে কাকার বাড়ি বেড়াতে যান। গিয়ে দেখি, এক পাকুড়গাছের তলায় বীজ পড়ে চারা গজিয়েছে। সেখান থেকে চারা নিয়ে আসি। লাগাই শ্যামপুর গ্রামের তিন রাস্তার মোড়ে। তখন আমার বয়স ১০ বছর। সেই আমার গাছ লাগানো শুরু। ওই চারাগাছই এখন এলাকার বড় গাছের একটি। গাছের বয়স ৬২ বছর। অনেক কষ্ট করে গাছটিকে যত্ন করি, রক্ষা করি ঝড়-বৃষ্টি থেকে। যেন ছোট গাছটা ভেঙে না পড়ে। এ জন্য কখনো-সখনো ভিজতে ভিজতে গাছটি ধরে দাঁড়িয়ে থেকেছি।
গাছটি কিছুটা বড় হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় প্রতিবছর আমার গাছ লাগানো। গ্রামের রাস্তাঘাট, হাট-বাজার, ঈদগাহ-গোরস্থান, বিডিআর (বতর্মানে বিজিবি) সীমান্ত ফাঁড়ি কোনো স্থানই বাদ যায়নি। হাট-বাজারে নাপিতের কাজ করি। সেই উপার্জনের টাকা দিয়ে গড়ে তুলি নার্সারি। গাছে ঠেকা দেওয়ার জন্য কিনি বাঁশ। গাছ লাগানোর সময় মজুর লাগাই। মানুষজন আমাকে পাগল বলে। ঠাট্টা-মশকরা করে বলে, গরিবের ঘোড়ারোগ ধরেছে। আরও বলে, বছর বছর গাঁটের পয়সা খরচ করে গাছ লাগিয়ে তোমার কী লাভ? মনে মনে বলি, ইহকালে লাভ না হোক পরকালে তো হবে। মানুষ যদি দোয়া না করে তো কি। পাখ-পাখালি তো করবে। তারা বট-পাকুড়-জামগাছে বসবে। ফল খাবে। তাদের জন্যও তো গাছ দরকার। বছর বছর গাছ লাগাতে লাগাতে এলাকার ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গাছে গাছে ভরে যায়। আমরা দেখি লোকে এখন বাড়ির ফাঁকা জায়গায়ও গাছ লাগায়। অনেক দিন আগে থেকেই এলাকা সবুজে ভরে গেছে। একদিন এখানে যে ধু ধু বালুর চর ছিল, তা বোঝাই যায় না।
গাছ লাগানো শুরুর ৫৩ বছর পর প্রথম আলো আমাকে আবিষ্কার করে। ২০০৩ সালের ২ নভেম্বর আমাকে নিয়ে খবর প্রকাশ করে। প্রথম পাতায় খবরের শিরোনাম ছিল, ‘বিরাট বিরাট বৃক্ষ যেন একেকটি কার্তিকনামা’। খবর প্রকাশের পর আমাকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বন্ধুসভা প্রথম সংবর্ধনা দেয়।
ওই বছরের ৪ কি ৫ ডিসেম্বর তত্কালীন বিডিআরের ৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল শহীদ উদ্দিন খান পিএসসি আমার গাছ লাগানোর ইতিহাস শুনে তিনি আমাকে মনাকষা বিওপিতে ডেকে পুরস্কার প্রদান করেন। সেই খবর পেপার-পত্রিকায় প্রকাশ পাওয়ার পর আমার কথা দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। আর আমাকে নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়। তার পর থেকেই আমি হয়ে গেছি ‘বৃক্ষপ্রেমিক কার্তিক পরামানিক’। বর্তমানে আমি অনেক পুরস্কার লাভ করেছি। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, প্রথম আলো বন্ধুসভা পুরস্কার (২০০৩), রাজশাহী সিটি করপোরেশন পুরস্কার (২০০৩), বনবিভাগ ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের বৃক্ষমেলা পদক (২০০৭), বৃক্ষরোপণে প্রধান উপদেষ্টার জাতীয় পুরস্কার (২০০৬), গণস্বাস্থ্য পদক (২০০৭), চার্চ অব বাংলাদেশ সোসাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম রজতজয়ন্তী পুরস্কার (২০০৭), চ্যানেল আই কৃষি পদক (২০০৭), চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শিক্ষক সমিতির পুরস্কার (২০১২), মার্কেন্টাইল ব্যাংক সম্মাননা পদক (২০১৩) এবং স্টান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংক পদক (২০১৪)। এ ছাড়া ২০১৩ সালে অষ্টম শ্রেণির ইংরেজি বইয়ে আমাকে পাঠ্য তালিকায় নিয়ে আসা হয়েছে। এটিও আমার কাছে বড় পাওয়া।(২০১৩ সালে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অষ্টম শ্রেণির ইংরেজি পাঠ্যবইয়ে ‘আ ম্যান হু লাভস ট্রি’ শিরোনামে তাঁর কীর্তি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।) আজ একটি কথা মনে পড়ছে, তা হলো ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আনোয়ারুল ইকবাল আমার চাওয়া পাওয়া কি জানতে চাইলে, আমি বলি ব্যক্তিগতভাবে আমার চাওয়ার কিছু নেই। তবে এলাকার মানুষের বড় অভাব হচ্ছে রাস্তার। সেসময় তিনি আমাকে ৮ কি. মিটার রাস্তা ও দুটি সাঁকো নির্মাণের আশ্বাস দেন। ওই সময় আমার চোখে জল চলে আসে। পরবর্তীতে এলাকাবাসী রাস্তা ও সাঁকো পেয়েছে। আজ আর পায়ে হেঁটে মনাকষা বা শিবগঞ্জ আসতে হয় না।
২০১০ সালের মধ্যেই আমার গ্রাম পর্যন্ত রাস্তাটি পাকা করে দেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। রাস্তাটা পাকা হওয়ায় এলাকার লোকজন আমাকে খুব সম্মান করেন। কাছে ডেকে কৃতজ্ঞতা জানান। প্রশাসনের লোকজনও আমাকে সম্মান করেন। আমার কথা রাখেন। এলাকার লোকজন কোনো সমস্যায় পড়লে আমার কাছে ছুটে আসেন। আমি স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাদের সঙ্গে কথা বলি। মানুষের উপকার করতে পেরে আনন্দ পাই।
আগে মনে হতো, গাছ লাগানোর ফল পরকালেই পাব। কিন্তু প্রথম আলোয় সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর আমার খবর ছড়িয়ে পড়ে। তার ফল এ জীবনেই পেতে শুরু করি। প্রথম আলোর ১০ বছর পূর্তিতে আমার ছবিসহ বড় বড় সাইনবোর্ড ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে লাগায় তারা। ঢাকায় কর্মরত এলাকার লোকজন এসে আমাকে জানান সে কথা। আমি নিজে গিয়ে দেখে আসি। আনন্দে-গর্বে আমার বুক ভরে যায়। এ জীবনে এত সম্মান আর এত ভালোবাসা পাব কখনো ভাবিনি। যদিও সম্মান বা কোনো কিছু পাওয়ার আশায় গাছ লাগাইনি। পথক্লান্ত পথিক, পাখপাখালিকে একটু শান্তি দিতে ও এলাকার ধু ধু পরিবেশ দূর করতেই গাছ লাগিয়েছি। এই শরীর যত দিন চলবে, গাছ লাগানোও তত দিন চলবে।
সবার কাছে আমার আবেদন, বেশি বেশি গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান। না হলে আমরা ভালোভাবে বাঁচতে পারব না। পাখপাখালিও বাঁচতে পারবে না। এ ছাড়া, গাছই তো জীবন।

Source:

http://archive.prothom-alo.com/detail/date/2012-11-23/news/308194
http://www.bd-pratidin.com/home/printnews/133114/2016-03-17

No comments:

Post a Comment